খোয়াবনামা….

0
53

মুরগিটোলার মোড় থেকে ধোলাইখালে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে ঝপ করে বৃষ্টি নেমেছিল। তড়িঘড়ি করে আশ্রয় নিলাম একটা মোটর পার্টসের দোকানে। আটকে পড়া অনেকে ইতিমধ্যে হাঁচির কলরবে শামিল হয়েছে। বিরক্ত হয়ে একদিকে সরে দাঁড়াতে গিয়ে লোকটাকে প্রথম দেখলাম।

দীর্ঘদেহী সুদর্শন মানুষ। বয়স পঞ্চাশ হবে হয়তো। পরনে ইন করা হাফ শার্ট ও ফর্মাল প্যান্ট। চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা। পায়ে কালো বেল্টওয়ালা স্যান্ডেল। লোকটার হাতে একটা পাইপ। বৃষ্টি দেখতে দেখতে লোকটা একমনে পাইপ টানছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী চারপাশে ছড়াচ্ছে। অস্ফুটে বলে উঠলাম, ‘ইলিয়াস!’

লোকটা শুনতে পেল কি না, জানি না। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। তারপর স্মিত হেসে মনোযোগ দিল বৃষ্টিতে। আমি তখন ভীষণ অবাক, দ্বিধার কাঁটা পেণ্ডুলামের মতো ভেতরে দুলছে। কাজটা সহজ করে দিল দোকানদার। লোকটার উদ্দেশে বলল, ‘আকাশ হালায় মনে লয় ফুটা হইয়া গেছে পরফেসার সাব।’

লোকটা ফুঁ দিয়ে পাইপের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘তুমি হালায় মাল টাইনা ঘুমাও নাকি? পরশু দিন কেমুন বৃষ্টি হইছিল ইয়াদ করবার পাও না?’

দোকানদার আর কথা বাড়াল না। মেঝেতে বসে প্রকাণ্ড একটা ইঞ্জিন পরিষ্কার করছিল কমবয়সী একটা ছেলে, তার উদ্দেশে খেঁকিয়ে উঠল।

আমি লোকটাকে বললাম, ‘মাফ করবেন, আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। আপনি কি প্রফেসর ইলিয়াস?’

লোকটা একটু থমকে গেল। আমাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি কলেজে পড়াই বটে। কিন্তু ইলিয়াস নই।’

 ‘আপনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নন?’

খোয়াবনামা

আমার কথা শুনে লোকটা কিছুক্ষণ ঠা ঠা করে হাসল। ঠোঁটের পাশ থেকে কষ মুছতে মুছতে বলল, ‘এই ভুলটা অনেকেই করে। আমাকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে।’

এবার লোকটার কথায় স্পষ্ট হয় বগুড়ার টান। উত্তরবঙ্গের মানুষ বলে ঠিক ধরতে পারি। বলি, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি ইলিয়াস। আমি আপনার লেখার খুব ভক্ত। আমার পড়ার টেবিলে আপনার রচনাসমগ্র সব সময় সাজানো থাকে।’

লোকটা এবার রেগে যায়। পাইপের আধপোড়া তামাক উপুড় করে দেয় কাকভেজা ফুটপাতে। উড়ন্ত স্ফুলিঙ্গ দেখে আশপাশের মানুষ সভয়ে সরে যায়। লোকটা রাগী গলায় বলে, ‘বাইছলামি করেন আমার লগে! কইতাছি আমি ইলিয়াস না, তা-ও শুনবেন না। সাইডে গিয়া খাড়ান মিয়া।’

অনুমানে যে ভুল হয়নি এবার নিশ্চিত হই। বলি, ‘আপনার খোয়াবনামা…।’ লোকটা আমার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। দোকানদার ডাকে, ‘মঞ্জু ভাই, ছাতা লয়া যান।’

সন্ধ্যার আকাশে ঝলসে ওঠে বিদ্যুৎ। লোকটা একবার পেছনে ফিরে তাকায়। দ্রুত পায়ে অদৃশ্য হওয়ার আগে লোকটার মুখে ঝলমল করে পরিতৃপ্তির হাসি।

নিয়াজ মেহেদী

ইস্কাটন, ঢাকা

LEAVE A REPLY